নাগরাকাটা: কখনও অনাবৃষ্টি আর চড়া রোদ পুড়িয়ে দিচ্ছে চা বাগান, আবার কখনও টানা বৃষ্টি ভাসিয়ে দিচ্ছে হেক্টরের পর হেক্টর জমি! উত্তরবঙ্গের চা বলয়ে আবহাওয়ার এই আমূল পরিবর্তন চা শিল্পের চেনা ছবিকে ওলটপালট করে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কায় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বর্ষাকালেও বাগানগুলিতে কৃত্রিম সেচ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা একসময় অকল্পনীয় ছিল।(TeaGardenCrisis)
ভেঙে পড়েছে ফ্লাশ-এর চিরাচরিত নিয়ম
চা শিল্পের ট্র্যাডিশনাল ‘ফার্স্ট ফ্লাশ’, ‘সেকেন্ড ফ্লাশ’, ‘রেইন ফ্লাশ’ বা ‘অটাম ফ্লাশ’-এর সেই চেনা সময়সীমা এখন আর নেই। ২০২৫ সাল থেকে টি বোর্ড শীতের শুখা মরশুমে উৎপাদনে বিরতি বা ফের পাতা তোলার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে বাগানগুলির ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ডুয়ার্সের কূর্তি বাগানের সিনিয়র ম্যানেজার রাজেশ রুংটার কথায়, “এখন আর ওই হিসেব খাটে না। নীরবে চা শিল্পে একটা বড়সড়ো পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে।”
টি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন (টিআরএ)-এর বিজ্ঞানীদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আর্দ্রতার ভারসাম্যহীনতা চা গাছের জীবনীশক্তি একপ্রকার নষ্ট করে দিচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য বলছে, মোট বৃষ্টির পরিমাণ না কমলেও ‘টরেনশিয়াল রেইন’ বা একলপ্তে প্রচুর বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। এর ফলে পাহাড় ও ডুয়ার্সের মাটি আলগা হয়ে গিয়ে চা গাছের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। টিআরএ-র অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী ডঃ সৌমেন বৈশ্য জানান, এই সংকট মোকাবিলায় মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, ছায়াগাছ রোপণ এবং বাতাস প্রতিরোধী বৃক্ষ রোপণের মতো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
নতুন রোগ ও গুণগত মানের হ্রাস
আবহাওয়ার এই চরমভাবাপন্ন পরিস্থিতির কারণে চা গাছে এখন ব্যাকটিরিয়াল ব্লাইট, ফিউসেরিয়াম ডাইব্যাক, গ্রে ব্লাইট এবং রেড রাস্টের মতো নিত্যনতুন রোগ দেখা দিচ্ছে, যা আগে কখনও দেখা যেত না। মাল নদী চা বাগানের ম্যানেজার রাজা চক্রবর্তী জানান, গুণগত মান কমে যাওয়ায় নিলাম বাজারেও চা আর সঠিক দাম পাচ্ছে না।
ক্ষুদ্র চা চাষিদের অবস্থাও শোচনীয়। জলপাইগুড়ি জেলা ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির সম্পাদক বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলেন, “ফ্লাশগুলি পিছিয়ে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। চায়ের সেই আদি সুগন্ধও আর মেলে না।”
বদলে যাচ্ছে ‘শুখা মরশুম’-এর সংজ্ঞা
একসময় ডুয়ার্স-তরাইয়ে বছরে প্রায় নয় মাস বৃষ্টি হলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র পাঁচ মাসে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ডিসেম্বরেও সবুজ পাতার সমাহার দেখে বাগান কর্তৃপক্ষকে শুখা মরশুমের চিরন্তন সংজ্ঞা বদলাতে হয়েছে। গত বছর ডিসেম্বরেই ডুয়ার্স ও তরাইয়ে যথাক্রমে ১৮.৭০ ও ২০.৯৭ মিলিয়ন কিলোগ্রাম চা উৎপাদিত হয়েছে।
আবহাওয়ার এই ‘নিউ নর্মাল’-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে বহু বাগান ধীরে ধীরে রুগ্ন হয়ে পড়ছে। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্পের এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এখন কেবল ব্যবসার মুনাফার বিষয় নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের মারপ্যাঁচে টিকে থাকার এক কঠিন বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে
